ইন্দ্রর মনে রঙ লেগেছে, সরকার বাড়ীর বৌ , ২য় পর্ব

 ইন্দ্রর মনে রঙ লেগেছে 

সরকার বাড়ীর বৌ, ২য় পর্ব

অতনু সরকার

সরকার বাড়ীর বৌ





ইন্দ্রজিৎ কাজে বাহির হইবার আগে, দোতলার বারান্দায় আসিয়া আয়না লাইয়া চুলের পাট করিতেছিল। এখন  বেশ বেলা হইয়াছে। সাড়ে দশটা, বাজিয়া গিয়াছে। অভি, স্বপা, শ্রেয়া সকলেই স্কুলে আর কলেজ বাহির হইয়া গিয়াছে। ইন্দ্রর  কোন তাড়া নাই। তাই সে ধীরে ধীরে চুলের পাট করিতেছে। সময়টা বসন্ত কাল। একটি লম্বা কৃষ্ণচূড়া গাছের ডাল দোতলার রেলিংএর উপর আসিয়া পড়িয়াছে। গাছটি তাহাদের। দু-একটি পাখি গাছে ডাকা ডাকি করিতেছে। হঠাৎ ইন্দ্রের চোখ পড়িল রাস্তার ওপর। দেখিল তাহার বড় মাসি আসিতে আসিতেছে কিন্তু সঙ্গে একটি যুবতী। দুজনেই বাহিরের গেট খুলিয়া ভিতরে ঢুকিল। ইন্দ্র দেখিল মেয়েটির বয়স বেশি নয়। সুন্দর করিয়া একটি হাল্কা সবুজ রঙের কাপড় পরিয়াছে। ইন্দ্র ভাবিল কে হইতে পারে। বড়মাসির তো দুই ছেলে। তবে এটি কে? ইন্দ্র রেলিং হইতে সরিয়া আসিবার পূর্বেই অতিথিরা নীচের ঘরে ঢুকিয়া পড়িয়াছে। সেই সময় ইন্দ্র কৃষ্ণচূড়া গাছটার দিকে চাহিল কিন্তু কি আশ্চার্য হঠাৎ সেই নবগতার মুখটি ভাসিয়া উঠিল উঠিল। ইন্দ্র আর অপেক্ষা না করিয়া নীচে নামিয়া আসিল। এইবার তাহাকে যাইতে হইবে। নীচে আসিয়াই বড় মাসির সহিত দেখা। তাহাকে দেখিয়া ইন্দ্র একটা প্রণাম করিয়া বলিল- ভালো তো মাসি?


দেবলা খুসি হইয়া আর্শিবাদ করিয়া বলিল- হ্যাঁ, বাবা। 


ইন্দ্র আড় চোখে দেখিল সেই মেয়েটিও আছে। ইন্দ্র একটু ইতঃস্তত করিছেতে দেখিয়া দেবলা দেবী বলিল-এখন কোথায় বেরবি?


ইন্দ্র-কাজে।


বলিয়া মা মা  করিয়া দুইবার ডাকিল। আশা কি একটা  করিতে পাশের ঘরেই গিয়াছিল। ইন্দ্রর ডাক শুনিয়া তাড়াতাড়ি আসিয়া বলিল-কিরে কি হলো?


ইন্দ্র- আমি আসছি এখন।


আশা- আয়!


দেবলা- দেখে শুনে যাস বাবা! 


ইন্দ্র বাহির হইয়া গেল। আশা  দেবী সকলকে লইয়া তাহার ঘরে গেল। 


তাহার পর সেই সুন্দরী তরুনির দিকে চাহিয়া বলিল- তোমার নাম কি মা?


নবাগতা অত্যন্ত শান্ত এবং ধীর গলায় বলিল - তানিয়া রায়।


আশাদেরী পুনরায় বলিল- কি পড়?


তানিয়া  – এবার কলেজে ভর্তি হয়েছি।


আশা- বাঃ বেশ।


দেবলা- মেয়ে নিয়ে তোকে ভাবতে হবে না।


আশা কি একটা বলিতে  যাইতে ছিল কিন্তু ঠিক সেই মুহুর্তে  ছোট্ট সায়ন আসিয়া বলিল-মা- ওমা।


আশাদেবীর একটু বেশি বয়সেই এই ছোট সন্তানটির জন্ম হয়। তাহার ডাক শুনিয়া আশাদেরী তাহাকে কোলে তুলিয়া লইল। তাহার পর আরও কিছু কথা বার্তা হইল।


আজ কিছুতেই  ইন্দ্র কাজে মন বসাইতে পারিতেছে না। তাহার স্বর্গীয় পিতা যে প্লাসটিকের কারখানা স্বাপন করিয়াছিল তাহা ইন্দ্র এখন দেখাশোনা করে। আপাতত সেই মালিক। বেশ কয়েক জন কর্মচারি ও রহিয়াছে। কিন্তু কিছুতেই সে আজ কাজে মন বসাইতে পারিল না। তাই ম্যানেজার কে কিছু একটা  অজুহাত দিয়া আজ সে বাড়ি ফিরিয়া আসিল।


ইন্দ্র তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরিয়া আসিল। তাহাকে বাড়ী ফিরে আসিতে দেখিয়া আশা দেবী বেশ একটু অবাক হইয়া বলিল- হ্যাঁরে ইন্দ্র শরীর খারাপ নাকি?


ইন্দ্র- তেমন কিছু নয় মাথাটা একটু ধরেছে। 


আশা-এই বেলায় আবার মাথা ধরল যে। শরীর খারাপ নয়তো? যা ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়।


ইন্দ্র এদিক অদিক  কয়েক বার চাহিয়া ঘরে ঢুকিতে গেল তখন দেখিল, সেই নবাগতা তাহার ঘরে বসিয়া তাহারই একটা গল্পের বই পড়িতেছে।


ইন্দ্র ঘরে ঢুকিয়া আবার বাহির হইয়া পাশের ঘরে আসিয়া শুইয়া পড়িল। তানিয়া  তাহাকে একবার দেখিয়া আবার গল্পের বই-এ মননিবেশ করিল। 


ইন্দ্রদের বাড়ীটা বেশ বড়। নীচে দুটি শোবার ঘর, একটি বসবার ঘর, রান্না ঘর এবং একটি খাবার ঘর। উপরে ও তিনটে ঘর। বর্তমানে তাহা পড়াশুনার কাজে ব্যবহার করা হয়। উপরের একটি ঘরে ইন্দ্র থাকে। বাকিরা সব থাকে নীচে। পাশের ঘরে আসিয়া ইন্দ্র কিছুতেই স্থির হইয়া শুইতে পারিল না। ওদিকে তানিয়া ও গল্পের বই বন্ধ-করিয়া জানালার ধারে আসিয়া দাঁড়াইল। তানিয়া ও অবশ্য এখানে আসার কারণ কিছুটা আঁচ করিতে পারিয়াছে।  ইন্দ্রকে দেখিয়া তানিয়া কেমন যেন উদাস হইয়া গেল। আশা দেবীর তখন ও রান্না শেষ হয়নি। দেবলা আশার সঙ্গে যুক্তি করিয়া উপরে উঠিল। কিন্তু দেখিল দুইজন দুই ঘরের জানালা দিয়া বাহিরের দৃশ্য দেখিতেছে। 


দেবলা ইচ্ছা করিয়া ইন্দ্রর ঘরে প্রবেশ করিয়া বলিল- বিক রে ইন্দ্র আজ সকাল সকাল ফিরলি যে?


ইন্দ্র মাসির দিকে ঘুরিয়া বলিল- হঠাৎ করে মাথাটা ধরে গেল। ভালো লাগছিল না।


দেবলা মনে মনে বুঝিল মাথা ব্যাথার কারণ। বলিল – আয় তোকে তানিয়ার সঙ্গে পরিচয় করে দিই।


ইন্দ্র বলিল- তানিয়া কে মাসি?


দেবলা - আমার ছোটজায়ের মেয়ে। এই তো কলেজে যাচ্ছে সবে। আমি এলাম তাই বললাম চল ঘুরে আসি। 


ইন্দ্র- ভালোই করেছ।


দেবলা- আয়।


দেবলা ইন্দ্রকে লইয়া  তানিয়ার কাছে গেল। যদিও, এই ঘরটাই ইন্দ্রের। একটু আগেই ইন্দ্র এই মেয়েটি কে দেখিয়াছিল।


ঘরে পায়ের শব্দ শুনিয়া তানিয়া জানালা হইতে মুখ ফিরাইয়া দেখিল তাহার জ্যাঠাইমা কে। এবং সঙ্গে....।


দেবলা  ইন্দ্রকে বলিল- ইন্দ্র এই হল তানিয়া, আমাদের বাড়ির ছোট মেয়ে। আর তানি, এই হলো ইন্দ্র এ বাড়ীর বড় ছেলে। 


ইন্দ্র এবং তনিমা পরস্পর প্রনাম বিনিময় করিল। তাহারপর দেবলা বলিল- তোরা কথা বল আমি দেখি রান্নার কি হলো দেখি গে।


দেবলা বালা দেবী ঝড়ের বেগে বাহির হইয়া গেল। ইন্দ্র এবং তানিয়া দুজন দুজনের দিকে চাহিয়া দাঁড়াইয়া রহিল। অনেকক্ষন পর ইন্দ্র বলিল- বসুন।


সে নিজে বিছানার এক পাশে বসিল। তানিয়া  দাঁড়াইয়া কি একটা ভাবিতে ছিল। ইন্দ্র আবার বলিল-বসুন গল্প করা যাক।


তানিয়া  এইবার বিছানার ওপর পাশে বসিল। ইন্দ্র পরিবেশ টা কে স্বাভাবিক করিবার জন্য বলিল- এই যে ঘরটা দেখছেন এটা আমার ঘর। আর পাশের দুটোতে ভাইরা পড়াশোনা করে। বোন আর ছোট ভাই মার কাছে পড়ে।


তানিয়া  এইবার একটু স্বচ্ছন্দ বোধ করিল, সে মুখ তুলিয়া বলিল- এই ঘরে ঢুকেই বুঝেছিলাম যে এটা ইন্দ্রজিৎ বাবুর ঘর। কিন্তু আপনি যে ইন্দ্রজিৎ বাবু তাতো এখন জানলাম। 


ইন্দ্র খুসি হইয়া বলিল- কি করে বুঝলেন এটা আমার ঘর? 


তানিয়া - প্রত্যেকটি বইতে যে আপনার নাম লেখা আছে সে।


ইন্দ্র এক চোট হাসিয়া বলিল- তাই বলুন।


তানিয়া - আপনি কি করেন?


ইন্দ্র- আমাদের একটা ছোট কারখানা আছে তাই দেখাশুনা করি। আপনি?


তানিয়া - এইতো উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে কলেজে ভর্তি হলাম।


ইন্দ্র-এরপর?


তানিয়া - পড়ার ইচ্ছা আছে। দেখি বাবা-মা কি বলে।


ইন্দ্র তাহার মুখের দিকে চাহিয়া তাহার রূপ সুধা পান করিতে ছিল। হঠাৎ দুজনের চোখাচোখিতে দুজনেই লজ্জা পাইয়া মাথা নত করিল।


আর ঠিক সেই সময় আশা দেবী তাহাদের খাইতে ডাকিল।


দুপুরে আহার সমাপ্ত করিয়া ইন্দ্র নিজের ঘরে আসিয়া গড়াইয়া পড়িল। নীচের ঘরে তনিমা তাহার জ্যাঠাইমার কাছে শুইয়া পড়িল। আশা সায়নকে লইয়া পাশের ঘরে ঘুম পারাইবার অবস্থা করিতেছে। অল্প কিছুমানের মধ্যেই দেবলা দেবী ঘুমাইয়া পড়িল। আশাদেবী ও সায়নের পাশে ঘুমাইয়া পড়িল। কিন্তু তানিয়ার কিছুতেই ঘুম আসিল না। সে ধীরে ধীরে বিছানা ছাড়িয়া উঠিয়া উপরের দিকে গেল।


ইন্দ্ররও ঘুম আসিল না। ইন্দ্র তাহার শোবার ঘরের আয়নায় চোখ রাখিয়া নিজেকে দেখিতেছিল। হঠাৎ সে সেই আয়নার মধ্যে একটি নারীমূর্তি দেখিয়া চমকিয়া অবাক হইয়া গেল। ভালো করিয়া আয়নায় চোখ রাখিয়া দেখিল তানিয়াকে । হ্যাঁ তানিয়াই তো। তবে এখন সে এখানে কেন?


তানিয়া ইন্দ্রর ঘরে না ঢুকিয়া নিজেকে আড়ালে রাখিয়া ইন্দ্রকে দেখিতে ছিল। ইন্দ্রর চেহারার একটা আভিজাত রহিয়াছে। আর ইন্দ্র সে মেতেছিল এক অষ্টাদশী তরুণীর কোমল তরু পল্লবীত রূপের মাধুরীতে।


কিছুখন দাঁড়াইয়া তানিয়া নিচে নামিয়া গেল। ইনফ্র ভাবিল সেও একবার নিচে নামিয়া তাহাকে দেখিয়া আসিবে। কিন্তু ঠিক সেই সময় পায়ে নূপুরের রুনুঝনু সুর তুলিয়া শ্রেয়া, তাহার ছোট বোন ঘরে প্রবেশ করিল। ইন্দ্র তাহাকে দেখিয়া বলিল-কিরে শ্রেয়া কিছু বলবি?


শ্রেয়া-আমি তোমার কাছে শোব।


ইন্দ্র - আয়।


বলিয়া তাহার শোবার জায়গা করিয়া দিল। তাহার পর বলিল- আজ নীচে কি হলো?


শ্রেয়া- নীচে মাসিরা শুয়েছে যে।


ইন্দ্র-ও!


শ্রেয়া একটু ইতস্তত করিয়া বলিল- বড়দা!


ইন্দ্র-বল।


শ্রেয়া - আমার একটা মাথার ফিতে আর একটা হেয়ার বেল্ট কিনে দেবে?


ইন্দ্র- তোর তো আছে।


শ্রেয়া- না, ওটা তো স্কুলের।


ইন্দ্র- তবে!


শ্রেয়া- অন্য আর একাটা দিতে হবে।সুন্দর দেখে। 


ইন্দ্র- আচ্ছা আজ রাতে এনে দেব।


শ্রেয়া- দেবে তো। তাহলে আমি যাই?


ইন্দ্র - কোথায়?


শ্রেয়া -নীচে।


ইন্দ্র- শুবিনা।


শ্রেয়া বিছানা হইতে নামিয়া বলিল- এই তো কত শুলাম।


বলিয়া আট বছরের ছোট শ্রেয়া যখন ঘর হইতে বাহির হইতে যাইবে তখন ইন্দ্র তাহাকে ডাকিয়া বলিল- শোন?


শ্রেয়া ঘুরিয়া বলিল- আমি আর শোব না।


ইন্দ্র- শুতে হবে না।


শ্রেয়া এইবার কাছে আসিয়া বলিল- বল।


ইন্দ্র- স্কুল থেকে কমন এলি?


শ্রেয়া- প্রশ্ন অনেকক্ষন।


ইন্দ্র - একটা নতুন দিদি এসেছে দেখেছিস?


শ্রেয়া- তানি দিদি?


ইন্দ্র-ও তুই  চিনিস!


শ্রেয়া-হ্যা।


ইন্দ্র- কোথায় রে?


শ্রেয়া- মাসির কাছে শুয়ে আছে।


ইন্দ্র- আচ্ছা তুই যা।


শ্রেয়া চুল বাধার নতুন ফিতে আদায় করিয়া, পায়ে সুর তুলিয়া নাচিতে নাচিতে নামিয়া গেল।


Post a Comment

You are Welcome to the Kotha Koli

Previous Post Next Post